মন্দির নগরী বিষ্ণুপুর ( জোড় বাংলা )
জোড় বাংলা
এক ঐতিহ্যময় টেরাকোটা মন্দির স্থাপত্য !!মন্দির হল হিন্দুদের আরাধনা স্থল বা প্রার্থনা গৃহ। সাধারণতঃ বড় মাপের মন্দির গড়ে ওঠে বিত্তবান বা রাজা জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায়। রাঢ়বঙ্গের এই মল্লভূমে তখনকার রাজারা যে সব মন্দিররাজি বানিয়ে গিয়েছিলেন, তার পর্যালোচনা যদি করা যায় আমরা দেখবো, প্রতিটি মন্দির তার স্থাপত্যের শৈলীগত উৎকর্ষ ও শিল্পগত ভাবনায় সমুজ্জ্বল।
আমরা যখন লালজী মন্দির দেখে এই জোড়বাংলা মন্দিরে এলাম, প্রথম দর্শনেই মনে হল, এটা তো নিছক ধর্মচর্চার স্থান নয় - মন্দিরের অপূর্ব অলঙ্করন তখনকার নিরীখে যেন একটা বেঞ্চমার্ক। কে বা কার সময়ে এটা বানানো হয়েছে তা এক নীরস ও শুষ্ক তথ্য মাত্র।
আমি ভাবছিলাম, এত এত মন্দিরের সমাবেশ এই বিষ্ণুপুরে, কেন একটা মন্দির আরেকটা থেকে আলাদা? শুধুমাত্র অলংকরনের জন্যই নয়- তার স্থাপত্য শৈলী ( উঃ ভারতীয় নাগারা শৈলী বা দেউল রীতি ; ওড়িসী রেখ বা পিঢ়া রীতি ও বাংলার চালা রীতি) , মন্দির নির্মানের উপাদান ( পোড়া ইট, মাকরা বা ল্যাটেরাইট পাথর, চুন সুড়কি ইত্যাদি ) ছাড়াও যে জিনিসটা আমায় হতবাক করে তা হল তখনকার কারিগরদের আশ্চর্য রকমের দক্ষতা ও ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল। পাশাপাশি টেরাকোটার ফলকের মাধ্যমে একটা কাহিনি বিবৃত করার মধ্যে যে মুন্সিয়ানার প্রয়োজন হয়, সব কিছুই তাদের দখলে ছিল। একটা মন্দির যেন তারা আগে থেকেই ভিস্যুয়ালাইজ করতে পারতেন। ভিত্তিপ্রস্তর থেকে একেবারে শিখর পর্যন্ত নির্মান কি কেবল পর-পর প্রক্রিয়া নাকি আগে থেকে ডিজাইন বা ড্রইং করে রাজা বা জমিদারদের কাছ থেকে এ্যপ্রুভাল নিতেন??? জানি না, এরকম কোন ডিজাইন বা ড্রইং পরবর্তী কালে আবিষ্কার হয়েছে কিনা!! এত হাজার হাজার টেরাকোটার প্যানেল কোথা থেকে বানিয়ে আসতো?আমার মেন্টর সত্যব্রতদা কে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, তিনি বললেন মন্দিরের আশেপাশেই টেরাকোটার শিল্প তৈরীর কারখানা থাকতো। শিল্পীরা ডিজাইন করে ছাঁচ বানিয়ে রাখতেন। তারপর কারিগররা কাঁচামাটির প্যানেল বানিয়ে পুড়িয়ে নিতেন। এবং এটা মন্দির নির্মানের স্থল থেকে বেশি দূরে থাকা সম্ভব নয়।
আপাততঃ আমার আলোচনা জোড়বাংলা মন্দির নিয়ে।। বীর হাম্বিরের পুত্র রঘুনাথ সিংহ ১৬৫৫ সালে এক অসাধারণ এবং পোড়ামাটির ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন এই জোড়বাংলা মন্দির বা কেষ্টরায়ের মন্দির গড়ে তোলেন। মাকড়া বা ল্যাটেরাইট পাথরের উচ্চভীতের ওপর ইটের বডি এবং পোড়ামাটির অলঙ্করন দিয়ে তৈরী দুটি দোচালা রীতির মন্দিরকে পাশাপাশি বসিয়ে তার ওপর একটি চারচালা মন্দিরকে বসিয়ে এক নতুন ধরনের গঠনশৈলী যা অন্য অনেক মন্দির থেকে একে আলাদা করে রেখেছে। যেমন রাসমঞ্চ তার গঠন রীতির জন্য একেবারেই আলাদা। আমার ও আমার সহযোগী বন্ধুদেরও এক ই মত। হ্যা , যা দেখলাম, এই মন্দিরের প্রথম দু চালার নীচে সামনের দিকে ত্রি-খিলান যুক্ত দালান ও দ্বিতীয় চালাটির নীচে গর্ভগৃহের অবস্থান। মন্দিরের ভেতরে সামনের দোচালার একপাশ থেকে অপর চারচালায় পৌঁছে যাবার সিঁড়ি আছে। বিষ্ণুপুরের অন্য সব মন্দিরে চূড়ায় ওঠবার জন্য সিঁড়ি আছে কিনা জানিনা। তবে এই মন্দিরে আসবার পথে আমরা তখনকার এক সম্পন্ন প্রজার ব্যক্তিগত মন্দিরের ( প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত ) মধ্যে দেখেছিলাম।। এই মন্দির গঠনরীতিতে কেন আলাদা তা তো বললাম। এবার আসি এর টেরাকোটা অলঙ্করন নিয়ে।
সমসাময়িক মন্দিরে হয়তো টেরাকোটার সুক্ষ কাজ ( যেমন শ্যাম রায়, মদনমোহন) আছে, কিন্তু এই মন্দির যে বিশিষ্টতা অর্জন করেছে , তা হল টেরামাটির ন্যারেশন। গল্প বলার আর্ট। পৌরাণিক কাহিনী তো বটেই, সমাজ জীবনের নানা চিত্র ও এখানে অতীব দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন সেই নাম না জানা শিল্পীরা।। এছাড়াও প্যানেলে দেখলাম নানা পশু ও ফুল লতা পাতার মোটিফ।মন্দিরের একেবারে নিচের অংশে যেখান থেকে টেরাকোটার কাজ শুরু হয়েছে, সেখানে দেখতে পেলাম সামাজিক জীবন যাত্রার টুকরো টুকরো কোলাজ। যেহেতু তখন বনাঞ্চল ঘিরে ছিল, তাই পশুপাখির আধিক্য ছিল বেশী। ফলতঃ শিকারযাত্রা- যেমন একটি বাঘ মানুষকে তাড়া করছে আর সেই মানুষটি ভয় পেয়ে গাছের ওপরে উঠে গিয়ে তীর ধনুক দিয়ে বাঘকে মেরে ফেলছে, আবার কোন ফলকে শিকারী তীর ধনুক নিয়ে শূকরের পিছনে ধাওয়া করছে.. পশুদের লড়াই - যেমন বাঘ সিংহ, হাতিতে বাঘে এসব ও বাদ যায় নি। সমাজ জীবনের আরো নিদর্শন এইসব ফলকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সেইসব নমস্য শিল্পীরা।
যেমন নৌকাবিলাস, রমনীর চুলের বিনুনী বাঁধার দৃশ্য, নবনারীকুঞ্জর ( নয়জন নারী মিলে একটি হাতির মতো আকৃতি করেছে ), জমিদার বা রাজার পালকি করে যাত্রা। এরপরে দেখলাম পৌরানিক কাহিনীর বিন্যাস - রামায়ণ থেকে আধারিত অন্ধমুনির জল ভরার দৃশ্য ও দশরথের কতৃক হত্যা। অভিশাপ। এছাড়াও আছে দশরথের তিন স্ত্রীকে পায়েশ খাওয়ানো। তাদের পুত্র সন্তান জন্মানো। চার ভাইকে অস্ত্র শিক্ষা। হরধনু ভঙ্গ, রামের সীতাকে বিবাহ, হনুমানের সূর্য ভক্ষন, বালী-সুগ্রীবের যুদ্ধ, পেছন থেকে রামের তির মারার দৃশ্য , বালী রাবনকে সমুদ্রে চোবাচ্ছে, রাম সেতু বন্ধন, লক্ষণ কুম্ভকর্নের যুদ্ধবানরসেনা ভার্সেস রাক্ষসসেনার যুদ্ধ প্রভৃতি।মহাভারতের কাহিনী ও বাদ পড়ে নি, ভীমের গদাযুদ্ধ, অর্জুন কতৃক ভীষ্মকে আহত করা শিখন্ডীকে সামনে রেখে। ভীষ্মের শরশয্যা।
এবার আসি কৃষ্ণলীলার কি কি আখ্যান রয়েছে এখানে- কৃষ্ণের ষড়ভুজ মূর্তি, কুঞ্জবনে কৃষ্ণের লীলা, বস্ত্র হরণ। বাল্য লীলার মধ্যে রয়েছে কৃষ্ণ কতৃক বকাসুর বধ, ষাঁড়ের সঙ্গে কৃষ্ণের লড়াই।এছাড়াও প্রতিষ্ঠা ফলকের তলায় রয়েছে কৃষ্ণ-বলরামের চিত্র ফলক।
বিষ্ণুর দশাবতার দৃশ্য থেকে বুদ্ধদেবের পায়েশ খাওয়ানার প্যানেলও রয়েছে।মুঘল বাদশাহরাও বাদ পড়েন নি। আছে শাহজাহানের ফলক। বিষ্ণুপুর রাজার আমোদ প্রমোদ ও তামাকু সেবনের ফলক ও আছে। আছে জলদস্যুদের যুদ্ধ ও হার্মাদদের আক্রমনের ফলক।।অন্য একটি ফলকে দেখা যায় রাজার উটে চড়ে ভ্রমণ। নারীদের প্রসাধনী ব্যবহার ও চোখে পড়ে।।ফুল লতা পাতার মোটিফ তো সারা অঙ্গ জুড়েই গল্প বলার ফাঁক ভরাতে।
পরিশেষে এটাই বলবো, এই মন্দির তার স্থাপত্যরীতি, শৈলী, টেরাকোটার অলঙ্করনের মধ্যে দিয়ে যে স্বকীয়তা অর্জন করেছে, তা রক্ষা করার দায়িত্ব শুধুমাত্র ASI বা সরকারের নয়, আমাদেরও!!
Comments
Post a Comment